“জনমানব দরদী” নামে সিস্টার ইভা ফিদেলার উপাধি লাভ

সিস্টার ইভা ফিদেলা যিনি (সিস্টারস অফ সেন্ট পল ডে চার্ট্রেস) সংঘের একজন ভগিনী, একাধারে তিনি একজন জনমানবদরদী চিকিৎসক, এক নিবেদিত প্রাণ ।তার  নিরলস কর্মের জন্য তিনি “বেয়ারফুট “ অর্থাৎ ( খালি পায়ে) চিকিৎসা দানকারী সিস্টার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

 ফিলিপাইনের এমন সব স্থানে তিনি গ্রামীণ সেবা দিয়েছেন যেখানে চিকিৎসা করার জন্য পর্যাপ্ত কোন সরঞ্জামই ছিলো না। উপরন্ত  চিকিৎসা করার দ্বিতীয় আর কোন সুযোগ ও ছিলো না।

১৯৭০ সালে লেক সেবু - এর প্রতন্ত্য একটি গ্রামে তিনি এক বাশেঁর তৈরি  টেবিলের উপর এক রোগীকে অস্ত্রোপচার করেন। এমন এক  প্রত্যন্ত্য গ্রামে তিনি রোগীকে সাময়িকভাবে সেবাদান এবং বাচিঁয়ে রাখার জন্য তিনি নারিকেলের পান করতে দিতেন। কারন হাসপাতাল ছিলো অনেক দূরে এবং পায়ে হেটে গেলেও একাধিক নদী পার হতে হতো।  

তবে সিস্টার ইভার কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিলো নিজে  অসুস্থদের কাছে পৌঁছানো নয়, বরং তিনি সেই ব্যাক্তিকে সেবাদান করার পরেও যেন ব্যক্তির সেবা চলমান থাকে তা নিশ্চিত করা।এই মনোভাবই তার সেবাকর্মের ধারাকে নির্ধারণ করেছে। তিনি নিজেকে চিকিৎসক হিসেবে নয় বরং স্থানীয় আরো অনেকজনকে  নিয়ে তিনি গড়ে তুলতে শুরু করেন“ বেয়াফুট ডাক্তার “ নামে একটি দল। যেখানে নারী পুরুষ সবায় প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে প্রশিক্ষিত ।

“বেয়ারফুট ডাক্তাররা পেশাদার ডাক্তার নয়, কিন্তু তারা সাধারণ রোগের চিকিৎসা দিতে প্রশিক্ষিত “ বলেন সিস্টার ইভা।২০০৫ সালে ম্যানিলাতে তিনি প্রথম এই কার্যক্রম শুরু করেন এবং সেবুতে ১৭জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা বিষয়ে শিক্ষা দেন । পরবর্তীতে ১১০টি আদিবাসী সম্প্রদায় থেকে ২৭৪জনকে তিনি এই “বেয়ারফুট” কাজে নিয়োজিত করেন।

সিস্টার ইভা শুধু চিকিৎসা দানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না । মানুষ যখন নিজেদের বসতবাড়ি গড়ে তুলতেন তখনও তিনি তাদের পাশে থাকতেন তাদের বুদ্ধি পরামর্শ দিয়েছেন এবং স্থানীয়ভাবে দলনেতাদের প্রশিক্ষন দিয়েছেন এবং অসুস্থদের শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি  তিনি তাদের আত্নমর্যাদা পুনরুদ্ধারের কাজও করেছেন।

সময়ের বির্বতনের ধারায় এবং কঠিন পরিশ্রমের ফলে আজ এই এলাকাটি একটি সুসংগঠিত রুপ পেয়েছে। আজ সেখানে ১৪৬টি পরিবারে মোট ৫০০ জনের ও বেশি মানুষ নতুন করে জীবন গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া তাদের মধ্যে ঈশ্বরের বিশ্বাস আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সিস্টারের এই  উদ্যোগ  আরো সুসংগঠিত রুপ লাভ করে Foundation of Our Lady of Peace Mission  এর মাধম্যে যা তিনি ১৯৮৪ সালে James Reuter (এস.জে.)-এর সঙ্গে যৌথভাবে প্রতিষ্ঠা করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল কমিউনিটি-ভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম টিকিয়ে রাখা এবং অবহেলিত অঞ্চলে চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দেওয়া।

 ফাউন্ডেশনের কাজ ধীরে ধীরে শুধু চিকিৎসা সেবার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তারা উপলব্ধি করেছিল যে স্বাস্থ্যকে দৈনন্দিন জীবন থেকে আলাদা করে দেখা যায় না। তাই জীবিকা, শিক্ষা, শিশুপুষ্টি এবং বয়স্কদের যত্নএইসব ক্ষেত্রেও বিভিন্ন কর্মসূচি গড়ে তোলা হয়।

তার বর্ষীয়ান বয়সে এসে সিস্টার ইভা একসময়  নীরবে বলেছিলেন, “Baka mawala na ako” (“আমি হয়তো শিগগিরই চলে যাব”)  যেন সেই উপলব্ধি যে, তার গড়ে তোলা এই মিশন একসময় অন্যদের হাতে তুলে দিতে হবে।

তার ৮৫ বছর বয়সে মৃত্যুসংবাদ যখন তিনি যাদের সেবা করেছেন তাদের কাছে পৌঁছায়, তখন থেকে যায় শুধু তার কাজের স্মৃতি নয়বরং সেইসব জীবন সম্প্রদায়, যারা আজও সেই কাজকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে।

আজ সিস্টার ইভাকে স্মরণ করতে গেলে তাকে শুধু একজন সার্জন, মিশনারি বা পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে দেখার প্রলোভন আসে। কিন্তু তার সেবা দান কোনো উপাধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি বেঁচে আছে তার কাজের নীরব ধারাবাহিকতায়সেসব গ্রামে, যেখানে প্রশিক্ষিত হাত এখনো অসুস্থদের সেবা করছে; সেসব সম্প্রদায়ে, যেখানে জ্ঞান অসহায়ত্বকে প্রতিস্থাপন করেছে এবং সেসব জীবনে, যা রক্ষা পেয়েছে শুধু তার উপস্থিতিতে নয়, বরং তিনি যা অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তার মাধ্যমে। সংবাদ – আরভিএ

 

Bengali pop up image