বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬: মারমারা পদ্ধতির আলোকে গ্রামীণ পরিবেশ সুরক্ষায় নতুন দিগন্ত উদয়নীর
বিগত ৫ জুন, ২০২৬: জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে উদয়নী সোশ্যাল একশন ফোরামের উদ্যোগে পালিত হলো বিশ্ব পরিবেশ দিবস। তবে এবারের উদযাপন প্রথাগত আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডি পেরিয়ে এক সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী রূপ নিয়েছিল জামালপুর ব্লক সহ কালনা-১, কালনা-২, পান্ডুয়া এবং বিষ্ণুপুর-১ ব্লকে ।
কেবল ব্যানার, দীর্ঘ বক্তৃতা আর চেনা ছকের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, তৃণমূল স্তরের মানুষকে পরিবেশ সুরক্ষার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তোলাই ছিল এবারের মূল লক্ষ্য। আর এই লক্ষ্য পূরণে কৌশলগত ভিত্তি হিসেবে প্রয়োগ করা হয়েছিল এক বিশেষ পদ্ধতি—"মারমারা পদ্ধতি"।
সমগ্র অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও সময়াবদ্ধ উপায়ে পরিচালিত হয়েছিল। শুরুতেই গ্রামের স্বনির্ভর গোষ্ঠীর নারীরা নির্দিষ্ট স্থানে সমবেত হন। মারমারা পদ্ধতির প্রথম ধাপ হিসেবে সবাইকে কোনো কৃত্রিম মঞ্চের সামনে না বসিয়ে, সমতার প্রতীক হিসেবে বৃত্তাকারে বসানো হয়। গ্রামের মানুষ যখন এইভাবে গোল হয়ে বসেন, তখন সেখানে কোনো ‘প্রধান অতিথি’ বা ‘সাধারণ শ্রোতার’ কৃত্রিম দেয়াল ছিল না। প্রত্যেকেই নিজেকে আলোচনার সমান অংশীদার মনে করেছিলেন।
অনুষ্ঠানের সংক্ষিপ্ত পরিচিতির পরেই শুরু হয় একটি 'প্রকৃতি-ভিত্তিক ধ্যান'। যান্ত্রিক কোলাহল ভুলে প্রকৃতির সাথে মানুষের এক অদ্ভুত আত্মিক সংযোগ তৈরি করাই ছিল এর উদ্দেশ্য। গ্রামীণ পরিমণ্ডলে পরিবেশ দিবসের দিন এই ধরণের ধ্যান একটি সম্পূর্ণ নতুন ও অভিনব ধারণা। এটি নারীদের গাছপালা ও মাটির প্রতি কেবল অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি (যেমন: কাঠ বা ফসল) থেকে বেরিয়ে এসে, একটি মানবিক ও আত্মিক সম্পর্ক তৈরি করতে গভীরভাবে সাহায্য করেছে। ধ্যানের পর অংশগ্রহণকারীরা অত্যন্ত আবেগঘনভাবে তাদের তাৎক্ষণিক অনুভূতি প্রকাশ করেন।
এরপর বিশ্ব পরিবেশ দিবসের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বর্তমান সময়ে এর গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। পরিবেশ বিষয়ক গণসংগীত ও সচেতনতামূলক স্লোগান পরিবেশনের মাধ্যমে গ্রামীণ সমস্যা গুলিও স্থান পায়। এর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তব প্রভাব এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর মারাত্মক ক্ষতি নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু তথ্যবহুল আলোচনা করা হয়।
অনুষ্ঠানটিতে সংস্কৃতির ছোঁয়া দিতে পরিবেশন করা হয় নাটক ও গান। বিশেষ আকর্ষণ ছিল কাগজের পুতুল বানিয়ে তার মাধ্যমে পুতুল নাটকের উপস্থাপন, যা উপস্থিত সবার নজর কাড়ে যা পরিবেশ সচেতনতার বার্তা দেয় । এই কর্মসূচি পালনের ক্ষেত্রে "মারমারা পদ্ধতির" ব্যবহারের ফলে যেমন কিছু অত্যন্ত ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক দিক সামনে এসেছে, তেমনি গ্রামীণ বাস্তবতায় এর কিছু নিজস্ব পরিকাঠামোগত চ্যালেঞ্জও পরিলক্ষিত হয়েছে।
আলোচনার পর উপস্থিত সবাই পরিবেশ রক্ষার সম্মিলিত শপথ গ্রহণ করেন। তবে অনুষ্ঠানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি ছিল—গ্রামের নারীরা নিজেদের এলাকার পরিবেশ রক্ষায় আগামী দিনের ব্যক্তিগত ও দলগত কর্মপরিকল্পনা তৈরি ও তা সবার সামনে উপস্থাপন করা।
নারীরা যখন নিজেরাই প্লাস্টিক বর্জন, যত্রতত্র আবর্জনা না ফেলা বা স্থানীয় জলাশয় সংস্কারের মতো আগামী দিনের রূপরেখা সাজাচ্ছিলেন, তখন আরও একবার প্রমাণিত হলো যে—পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকার বা কোনো এনজিও-র একার নয়; এটি তাদের নিজেদের অস্তিত্বের লড়াই।
কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, কর্মসূচির ব্যবহারিক প্রয়োগ হিসেবে গ্রামের নির্দিষ্ট স্থানে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পরিচালিত হয়। সবশেষে, ধন্যবাদজ্ঞাপন মধ্য দিয়ে এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সফল অনুষ্ঠানটির সমাপ্তি ঘটে।
প্রতিবেদন – পারোমিতা দত্ত