বনপাড়া লূর্দের রাণী মারিয়া ধর্মপল্লীতে অনুষ্ঠিত হলো ৪০তম জাতীয় যুব দিবস
গত ১ থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, এপিসকপাল যুব কমিশনের আয়োজনে বনপাড়া লূর্দের রাণী মারিয়া ধর্মপল্লীতে অনুষ্ঠিত হলো ৪০তম জাতীয় যুব দিবস।
এবারের যুব দিবসের মূলসুর ছিল, “তোমরাও আমার সাক্ষী, কারণ তোমরা আমার সাথেই রয়েছ”। এই মূলভাবটি আজকের যুবাদের আহ্বান জানাচ্ছে যেন তারা তাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে খ্রীষ্টের আদর্শকে তুলে ধরে।
জাতীয় যুব দিবসে বাংলাদেশের ৮টি ধর্মপ্রদেশ থেকে আগত আর্জবিশপ, বিশপ, ফাদার, ব্রাদার, সিস্টার, যুব সমন্বয়কারী, যুব সেক্রেটারী, এনিমেটর, সেচ্ছাসেবক ও যুবক-যুবতীসহ প্রায় ৪৫০জন অংশগ্রহণ করেন।
এই দিবস আমাদের শুধু একটি উৎসব নয়, বরং আত্মপরিচয়, দায়িত্ববোধ ও সাক্ষ্যদানের এক গুরুত্বপূর্ণ আহ্বান। সমকালীন বিশ্বেও নানাবিধ চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে এই দিবস আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায় আমরা কে? এবং আমাদের গন্তব্য কোথায়? যিশু খ্রিস্ট অমাদের আসস্থ করে বলেছেন, "তোমরাও আমার সাক্ষী, কারণ তোমরাই আমার সাথে রয়েছ” (যোহন ১৫:২৭) এই পবিত্র বাণী কোনো সুদূর অতীতের প্রতিধ্বনি নয়, বরং বর্তমানের অস্থির সময়ে যুবসমাজের প্রতি এক জীবন্ত ডাক।
জাতীয় যুব দিবসের শুরুতেই এপিসকপাল যুব কমিশনের নির্বাহী সচিব ফাদার বিকাশ জেমস রিবেরু, সিএসসি সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, “এই বছরের জাতীয় যুব দিবসটি হোক নবজাগরণ ও খ্রীষ্টের জীবন্ত সাক্ষী হওয়ার জীবনাহ্বান, অন্ধকারে আলো ছড়ানো, হতাশায় আশা জাগানো, বিভেদের মাঝে ঐক্যের সেঁতু তৈরি করা, সমাজ রূপান্তর ও নবীন উদ্দীপনা নিয়ে যাওয়ার এক যুব মহোৎসব ও তীর্থোৎসব।”
রাজশাহী ধর্মপ্রদেশের বিশপ জের্ভাস রোজারিও যুবাদের উদ্দেশ্যে বলেন, “আমার প্রিয় যুবা ভাই ও বোনেরা তোমাদের চোখে আমি দেখি মণ্ডলী ও দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। এই বছর যুব দিবসের ধ্যানের মূল বিষয় হলো "তোমরাও আমার সাক্ষী, কারণ তোমরা আমার সাথেই রয়েছ” (যোহন ১৫:২৭) এটি আমাদের প্রত্যেকেরই জন্য একটি আহ্বান।”
বিশপ রোজারিও আরও বলেন, “সাক্ষী হওয়ার অর্থ হলো যা সত্য তা প্রকাশ করা। আজকের এই জটিল পৃথিবীতে, যেখানে স্বার্থপরতা ও অস্থিরতা অনেক সময় আমাদের ঘিরে ধরে, সেখানে তোমাদের জীবন দিয়ে খ্রীষ্টের প্রেম প্রচার করতে হবে। তোমাদের সততা, অন্যদের প্রতি ক্ষমাশীলতা এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোই হবে তোমাদের শ্রেষ্ঠ সাক্ষ্য।”
“আমার প্রিয় যুবারা, তোমরা মণ্ডলীর হৃদস্পন্দন। তোমরা যদি খ্রীষ্টের সাথে পথ চলো, তবে তোমরা কেবল বাংলাদেশের খ্রিস্টান সমাজের নয়, বরং পুরো জাতির জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে উঠবে,” বলেন বিশপ জের্ভাস।
দিনাজপুর ধর্মপ্রদেশ থেকে অংশগ্রহণকারী প্রাপ্তি প্রিয়াঙ্কা আইন্দ তার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বলেন, “আমরা যুবারা যেন আধ্যাত্নিক ও নৈতিকভাবে পরিপক্কতা লাভ করতে পারি। যীশু আমাদের আহ্বান করেন আমরা যেন সকলকে নিয়ে একসাথে পথ চলতে পারি এবং একটি শান্তি ও সম্প্রীতির সমাজ গড়ে তুলতে পারি।”
“যুবা বা তরুণ সমাজ একটি জাতির আশা, শক্তি ও ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রতীক। জাতির টেকসই উন্নয়ন, উদ্ভাবন এবং সামাজিক কুফল দূর করতে যুবদের ভূমিকা অপরিসীম,” বলেন প্রাপ্তি আইন্দ।
এপিসকপাল যুব কমিশনের সভাপতি বিশপ সুব্রত বনিফাস গমেজ বলেন, “যুবা মানেই শক্তি, স্বপ্ন আর এগিয়ে যাওয়ার সাহস। কিন্তু একজন খ্রিস্টীয় যুবা হওয়া মানে শুধু স্বপ্ন দেখা নয়। বরং জীবন দিয়ে সেটা প্রমাণ করা।”
“আজকের যুব সমাজ নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। প্রতিযোগিতা, বিভ্রান্তি, হতাশা আর ভুল পথে টান-সবকিছু মিলিয়ে বিশ্বাস ধরে রাখা সহজ নয়। তবু যারা এসবের মাঝেও প্রভুর হাত ছাড়ে না, তারাই আলাদা হয়ে ওঠে। তারা শুধু কথায় নয়, কাজের মাধ্যমে দেখিয়ে দেয়- বিশ্বাস এখনও জীবিত,” বলেন বিশপ গমেজ।
বিশপ আরও বলেন, “সাক্ষী হওয়া মানে শুধু কিছু দেখা বা জানা নয়। সাক্ষী হওয়া মানে সত্যকে নিজের জীবনে ধারণ করা। তাই এই যুবোৎসবে আমরা আমাদের নিজেদের একবার প্রশ্ন করি আমরা কি কেবল বিশ্বাসী? নাকি বিশ্বাসের সাক্ষী? আমরা কি শুধু বিশ্বাসের কথা বলছি, নাকি আমাদের জীবনই বিশ্বাসের সাক্ষ্য হয়ে উঠছে?।”
“পোপ ফ্রান্সিসের সাথে সুর মিলিয়ে আমিও তোমাদের বলতে চাই। এগিয়ে যাও, সাহস রাখো এবং তোমাদের জীবন দিয়ে জগতকে রাঙিয়ে তোলো,” বলেন বিশপ গমেজ।
সঠিক শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধের মাধ্যমে নিজেদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সমাজ গঠনে সক্রিয় অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে এই যুব দিবস উদযাপনের মাধ্যমে।
এই জাতীয় যুব দিবসের শিক্ষার দ্বারা আলোকিত হয়ে নিজ নিজ কার্যক্ষেত্রে খ্রিস্টের আলোকে প্রজ্জ্বলিত করবেন বলে যুবারা অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
পাঁচ দিনের এই অনুষ্ঠান সূচির মধ্যে ছিল, পবিএ খ্রিস্টযাগ, শুভেচ্ছা বক্তব্য, পতাকা উওোলন, বর্ণাঢ্য যুব র্যালী, যুব দিবসের থিম সং, প্রার্থনা অনুষ্ঠান, ক্রুশের আরাধনা, পাপস্বীকার অনুষ্ঠান, বিভিন্ন বিষয়ের উপর ক্লাশ ও সহভাগিতা, এনিমেশন, আলোর উৎসব ও মূলায়ন এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
মাতামণ্ডলী সর্বদাই যুবাদের আহ্বান করেন যেন পুনরুত্থিত যীশুর স্পর্শে যুবাদের হৃদয় মন উন্মুক্ত থাকে এবং যীশুর স্পর্শে যুবাদের ভেতরের প্রাণশক্তি, স্বপ্ন, উৎসাহ ও আশা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়ে উঠে।
এই জাতীয় যুব দিবস ২০২৬ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, যুব সমাজ কেবল আগামীর ভবিষ্যৎ নয়, বরং তোমরা বর্তমানের উজ্জ্বল আশা। সত্যনিষ্ঠ, সহমর্মিতা, দায়িত্বশীলতা এবং অটুট বিশ্বাস এই চার স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করেই একটি আলোকিত সমাজ গঠন সম্ভব। - আরভিএ সংবাদ