সিনোডালিটি খ্রিস্টীয় জীবনযাপনের একটি পথ, কোন কর্মসূচি নয়-এফএবিসি কর্মকর্তা
সিনোডালিটি তখনই এশিয়ার মণ্ডলীতে সত্যিকার অর্থে ভূমিকা রাখবে, যখন এটিকে পালকীয় কর্মসূচি হিসেবে নয়, বরং মণ্ডলীর জীবন, শ্রবণ এবং সুসমাচার প্রচারের উদ্দেশ্যে রূপান্তরিত করার জীবনপদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করা হবে।
এ কথা বলেছেন ফাদার ক্ল্যারেন্স দেবাদাস, ফেডারেশন অব এশিয়ান বিশপস’ কনফারেন্স (FABC)-এর সহযোগী মহাসচিব এবং এফএবিসি সিনোডালিটি অফিসের নির্বাহী সচিব। তিনি ২৪ জুলাই জাকার্তার হোটেল মুলিয়ার লিয়াট্রিস মিডিয়া কক্ষে অনুষ্ঠিত এফএবিসি-এর দ্বাদশ পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনের দ্বিতীয় সংবাদ সম্মেলনে এ বক্তব্য দেন।
কার্ডিনাল মারিও গ্রেচ, কার্ডিনাল পাবলো ভার্জিলিও এস. ডেভিড রিবর্তন’— এশিয়ার মণ্ডলীর প্রতি কার্ডিনাল ইগনাশিয়াস সুহার্ত সাংবাদিকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার আগে ফাদার দেবাদাস সূচনা বক্তব্যে বলেন, সিনোড অন সিনোডালিটি এখন বাস্তবায়নের পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এ পর্যায়ে প্রতিটি স্থানীয় মণ্ডলীকে সিনোডালিটিকে সাময়িক প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং তাদের দৈনন্দিন মণ্ডলীজীবনের অংশ করে তুলতে হবে।
এশিয়ার মণ্ডলীর বর্তমান চ্যালেঞ্জ নিয়ে তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো অনেকের ধারণা—সিনোডালিটি কেবল ব্যস্ত পালকীয় কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত হওয়া আরেকটি নতুন কার্যক্রম।
তিনি বলেন, "অনেকেই মনে করেন সিনোডালিটি আরেকটি কর্মসূচি বা নতুন কার্যক্রম। কিন্তু সিনোডালিটি নতুন কিছু যোগ করার বিষয় নয়; বরং আমরা যা করছি, তা ভিন্নভাবে করার আহ্বান।"
তিনি স্বীকার করেন, অনেক যাজক ও পালকীয় কর্মীরা ইতোমধ্যে বিদ্যমান দায়িত্বে ক্লান্ত।
"অনেক যাজক আমাকে বলেছেন, 'আপনি আমাদের জন্য আরও একটি কাজ যোগ করছেন।'"—উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁর উত্তর সবসময় একই: সিনোডালিটি কোনো অতিরিক্ত বোঝা নয়; বরং শ্রবণ, বিচক্ষণতা, অংশগ্রহণ এবং যৌথ দায়িত্বের মাধ্যমে মণ্ডলীর মিশন সম্পাদনের নতুন পদ্ধতি।
ফাদার দেবাদাস এশিয়ায় সিনোডালিটি বাস্তবায়নের বিশেষ চ্যালেঞ্জের কথাও তুলে ধরেন। বিশ্বের বৃহত্তম ও সাংস্কৃতিকভাবে সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় এই মহাদেশে অনেক স্থানীয় ভাষায় "সিনোডালিটি" শব্দটির যথাযথ অনুবাদ করাও কঠিন।
তিনি বলেন, "ধরে নেওয়া হয় সবাই সিনোডালিটির অর্থ বোঝেন। কিন্তু এশিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে, যেখানে ইংরেজি ভাষা প্রচলিত নয়, সেখানে এই ধারণাটি কীভাবে অনুবাদ করা হবে?"
তিনি বলেন, এশিয়ার সাংস্কৃতিক, ভাষাগত ও সামাজিক বৈচিত্র্যের কারণে সিনোডালিটি বাস্তবায়নের জন্য একক কোনো মডেল হতে পারে না।
"এশিয়ার সব মণ্ডলীর সমস্যার সমাধান একটি মাত্র পদ্ধতিতে সম্ভব নয়। প্রতিটি স্থানীয় মণ্ডলীকে নিজেদের বাস্তবতার আলোকে নির্ধারণ করতে হবে, তাদের জন্য সিনোডালিটির অর্থ কী।"
ফাদার দেবাদাসের মতে, মূল বিষয় ভাষা নয়, বরং আধ্যাত্মিকতা।
তিনি বলেন, সিনোডালিটির সঙ্গে প্রকৃত আধ্যাত্মিক রূপান্তর যুক্ত থাকতে হবে। মালয় ও ইন্দোনেশীয় শব্দ 'কেরোহানিয়ান' (Kerohanian) উল্লেখ করে তিনি বলেন, সিনোডালিটি কেবল একটি প্রক্রিয়া বা পদ্ধতি নয়; এটি মণ্ডলীর জীবনযাপনের ধরন হয়ে উঠতে হবে।
তিনি বলেন, "সিনোডালিটি যদি কেবল একটি প্রক্রিয়া হয়ে থাকে, তাহলে মানুষ একসময় প্রশ্ন করবে—'এরপর কী?' কিন্তু এটি যদি আধ্যাত্মিকতা হয়ে ওঠে, তাহলে এটি প্রতিদিনের জীবনকে গড়ে তুলবে।"
তিনি আরও বলেন, এই আধ্যাত্মিকতা ধর্মপল্লীর পালকীয় পরিষদ, অর্থ পরিষদ, ধর্মপ্রদেশীয় সমাবেশ, ধর্মপল্লীর বিভিন্ন সেবাকাজ এবং প্রতিদিনের সিদ্ধান্ত গ্রহণসহ মণ্ডলীর প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রাণসঞ্চার করবে।
পুরো এফএবিসি অধিবেশনজুড়ে প্রতিনিধিরা বারবার উল্লেখ করেছেন যে, সিনোডাল রূপান্তর কেবল সাংগঠনিক পরিবর্তনের বিষয় নয়। ফাদার দেবাদাসও একই আহ্বান জানিয়ে বলেন, মণ্ডলীকে কেবল বিদ্যমান কাঠামো রক্ষার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে আরও মিশনারি মণ্ডলীতে পরিণত হতে হবে।
তিনি বলেন, "আমাদের রক্ষণশীল বা কেবল রক্ষণাবেক্ষণমূলক মণ্ডলী থেকে বেরিয়ে এমন এক মিশনারি মণ্ডলীতে পরিণত হতে হবে, যে মণ্ডলী মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।"
তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই নবায়ন মণ্ডলীর সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে পরিত্যাগ করে না; বরং আজকের বিশ্বে সুসমাচার ঘোষণার নতুন পথ খুঁজে পেতে সেই ঐতিহ্য থেকেই অনুপ্রেরণা গ্রহণ করে।
ফাদার দেবাদাসের বক্তব্য এফএবিসি পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনের অন্যতম মূল প্রতিপাদ্যকে পুনর্ব্যক্ত করে—সিনোডালিটি মূলত রূপান্তরের আহ্বান। এটি মণ্ডলীকে পবিত্র আত্মার আহ্বানের প্রতি আরও মনোযোগী হতে, শ্রবণ, সংলাপ ও যৌথ বিচক্ষণতার মাধ্যমে ঈশ্বরের জনগণের সঙ্গে পথ চলতে এবং একই সঙ্গে মণ্ডলীর সুসমাচার প্রচারের মিশনের প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে আহ্বান জানায়।
তিনি উপসংহারে বলেন, বিশ্বব্যাপী সিনোডালিটির বাস্তবায়ন এখন নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। এশিয়ায় এর সাফল্য নির্ভর করবে নতুন কাঠামো বা অতিরিক্ত কর্মসূচির ওপর নয়; বরং স্থানীয় মণ্ডলীগুলো কতটা আন্তরিকভাবে সিনোডালিটিকে সুসমাচার অনুযায়ী জীবনযাপন এবং যৌথভাবে মিশনের পথে চলার স্বাভাবিক পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করে, তার ওপর।
