এপিসকপাল যুব কমিশনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো ৩৩তম জাতীয় খ্রিস্টান লেখক কর্মশালা
গত ২৫ থেকে ২৮ মার্চ ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, এপিসকপাল যুব কমিশনের আয়োজনে এবং খ্রিস্টিয় যোগাযোগ কেন্দ্রের সহায়তায় আরএনডিএম রিনিউয়াল সেন্টারে অনুষ্ঠিত হলো ৩৩তম জাতীয় খ্রিস্টান লেখক কর্মশালা।
উক্ত কর্মশালায় বাংলাদেশের আটটি ধর্মপ্রদেশ এবং ঢাকা শহরের বিভিন্ন গঠনগৃহ ও সেমিনারি থেকে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ২৬ জন যুবক, ২০ জন যুবতী ও ৩ জন ব্রতধারীসহ মোট ৪৯ জন অংশগ্রহণ করেছে।
এ বছর লেখক কর্মশালার মূলসুর ছিল, “কলম হোক সুসমাচারের বাহক, শব্দ হোক পরিবর্তনের কারিগর”।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এপিসকপাল যুব কমিশনের নির্বাহী সচিব ও জাতীয় যুব সমন্বয়কারী ফাদার বিকাশ জেমস রিবেরু, সিএসসি সকল অংশগ্রহণকারীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, “ঈশ্বর প্রদত্ত অনুগ্রহের কারণে প্রত্যেক ব্যক্তি একজন স্বতন্ত্র লেখক, যা তাদের অধ্যয়ন, দর্শন, চিন্তা ও গবেষণামূলক ভাষার সৃষ্টির মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারেন।”
উদ্বোধনী খ্রিষ্টযাগের উপদেশে ফাদার বিকাশ বলেন, “আজ পবিত্র আত্মা তোমাদের মধ্যে অধিষ্ঠান করছেন, তিনিই তোমাদের কল্পনাশক্তিকে পবিত্র করে নতুন নতুন ধারণা ও উদ্দীপনা তৈরি করে “রাইটার্স ব্লক” (জড়তা কাটিয়ে) সৃজনশীল শব্দের প্রবাহে অত্যন্ত গভীর ভূমিকা রাখবেন।”
ওয়াইএমসিএস’র সাধারণ সম্পাদক মি: মানিক উইলভার ডি’কস্তা “লেখালেখি সুন্দর আর্ট, নান্দনিক শিল্প, দর্শন ও গবেষণার ফসল” এর উপর বাস্তবমুখী উপস্থাপনা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, “লেখক হলেন এমন একজন ব্যক্তি যিনি বিভিন্ন লেখার ধরণ এবং কৌশলে লিখিত শব্দ ব্যবহার করে ধারণা প্রকাশ করেন, অনুভূতি এবং আবেগকে অনুপ্রাণিত করেন।”
“খ্রিস্টীয় সাহিত্য ও খ্রিস্টীয় অনুবাদ সাহিত্যঃ বাইবেলীয় পুস্তক লেখার ধরণ ও উদ্দেশ্য” এর উপর উপস্থাপনা করেন ফাদার প্যাট্রিক শিমন গমেজ। তিনি পবিত্র বাইবেলের বাংলা অনুবাদ ও বাইবেল কিভাবে লিখা হয়েছিলো, বঙ্গানুবাদে ও বাংলা সাহিত্যের উন্নয়নে খ্রিস্টানদের অবদান এই বিষয়ে খুবই সুন্দরভাবে সহভাগিতা করেন।
অন্যদিকে “খবর, রিপোর্ট, স্পট রিপোর্ট ও ফিচার লেখা, হাতে-কলমে খবর লিখন, ফিচার/রিপোর্ট/ সংবাদ উপস্থাপনা ও মূল্যায়ন” এ বিষয়ে উপস্থাপনা করেন মি: শরীফ হোসেন হৃদয়, সিনিয়র সাংবাদিক, চ্যানেল আই টেলিভিশন।
তিনি বলেন, “লেখালেখি একটা সৃজনশীল কাজ। রিপোর্টিং একটা চমৎকার আর্ট এবং নান্দনিক শিল্প।”
পবিত্র খ্রিষ্টযাগের উপদেশ বাণীতে সিবিসিবি সেন্টারের পরিচালক ফাদার তুষার জেমস গমেজ বলেন, “একজন খ্রিস্টান লেখক হিসাবে তোমাদের চিন্তায়-অনুভূতিতে থাকবে ঈশ্বর, হৃদয়ে থাকবে যীশু ও কন্ঠে থাকবে পবিত্র আত্মা।”
এপিসকপাল যুব কমিশনের সভাপতি বিশপ সুব্রত বনিফাস গমেজ বলেন, “পবিত্র আত্মাই বাইবেলের মূল্যবোধের পক্ষে আপসহীনভাবে লিখতে ও লেখক হিসাবে তোমাদের আত্মশুদ্ধির পথে নিয়ে যাবেন, যাতে তোমাদের ব্যক্তিগত জীবন ও তোমাদের লেখা একে অপরের পরিপূরক হয়।”
“কলম হোক সুসমাচারের বাহক, শব্দ হোক পরিবর্তনের কারিগর” অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও অংশগ্রহণমূলক সেশন পরিচালনা করেন ফাদার বিকাশ জেমস রিবেরু, সিএসসি।
তিনি বলেন, “পবিত্র আত্মা একজন স্বর্গীয় নির্দেশক হিসেবে লেখকের চিন্তাধারাকে সত্য ও সৌন্দর্যের পথে পরিচালিত করেন এবং তিনিই একজন খ্রিস্টান লেখকের কলমকে কেবল একটি যন্ত্র থেকে “জীবন্ত সাক্ষ্যে” রূপান্তরিত করতে সহাতয়তা করবেন।”
পরবর্তীতে নটর ডেম কলেজের প্রভাষক ও আবৃতিকার মি: তিতাস ভিনসেন্ট রোজারিও বাংলা বানানের রীতি ও শব্দ উচ্চারণের কৌশল এর উপর খুবই চমকপ্রদ ও স্বাবলীলভাবে উপস্থাপন করেন।
অংশগ্রহণকারিদের বাস্তাবভিক্তিক বিভিন্ন বিষয়ে রির্পোট তৈরী করতে মাঠ পরিদর্শনে পাঠানো হয়। একই সাথে “খ্রিষ্টিয় গান লেখা ও সুর করার কৌশল” সমন্ধে উপস্থাপনা ও তার সংগ্রামী জীবন সহবাগিতা করেন বিশিষ্ট গীতিকার ও সুরকার মি: লিটন অধিকারী রিন্টু।
এরপর মানসম্মত ছবি তোলা বিষয়ে ধারণা, শর্ট ফিল্ম ও মৌবাইল রিপোর্ট তৈরি করার কৌশল ইত্যাদি বিষয়ে সংক্ষিপ্ত ধারণা প্রদান করেন মি: ফ্লেবিয়ান ডি’কস্তা ।
চার দিন ব্যাপী কর্মশালায় চতুর্থ দিন অংশগ্রহণকারীদের খ্রীষ্টীয় যোগাযোগ কেন্দ্র পরিদশর্নে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রথমে “এডিটিং, প্রুফ রিডিং, সম্পাদকীয় ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বাণী” লেখা সম্বন্ধে সুন্দরভাবে ধারণা প্রদান করেন, সাপ্তাহিক প্রতিবেশীর সম্পাদক ও সেন্টারের পরিচালক ফাদার বুলবুল আগষ্টিন রিবেরু ও তার সহকর্মীবৃন্দ।
পরবর্তীতে খ্রীষ্টীয় যোগাযোগ কেন্দ্রের কার্যক্রম, কর্ম পরিধি, বিভিন্ন সেক্টর যথা: সাপ্তাহিক প্রতিবেশী, জেরি প্রিন্টিং প্রেস, প্রতিবেশী প্রকাশনী, জ্যোতি কমিউনিকেশন বাণীদীপ্তি ও রেডিও ভেরিতাস এশিয়ার কার্যক্রম পরিদর্শন করা হয়।
উপরিউক্ত অধিবেশন ছাড়াও এই কর্মশালায় ছিল নিয়মিত প্রার্থনা ও খ্রিষ্টযাগ, দলীয় কাজ ও সহভাগিতা ও বিভিন্ন প্রতিবেদন উপস্থাপনা।
অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশ্যে “একজন লেখকের কী কী গুণাবলী, আদর্শ ও মূল্যবোধ থাকা আবশ্যক” সে ব্যপারে প্রধান অতিথিসহ সম্মানিত সকল অতিথিগণ অনুপ্রেরণামূলক কিছু কথা বলেন তাদের হাতে সনদপত্র তুলে দেন।
প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারী রাজশাহী ধর্মপ্রদেশের আনুষকা লরেনদিয়া সেরাও তার অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, “লেখালেখি কেবল যে একটি শখ নয়, বরং এটি একটি ‘কলিং’ বা ঈশ্বরপ্রদত্ত সেবা সেটা বুঝতে পেরেছি। আমি এই কর্মশালায় আমার কলমকে সুসমাচার প্রচার এবং সামাজিক পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে দেখার এক নতুন উদ্দীপনা পেয়েছি।”
চট্টগ্রাম মহাধর্মপ্রদেশের অংশগ্রহণকারী ইম্মানূয়েল অনিন্দ ডায়েস তার অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, “আমি অন্যান্য সমমনা যুবা লেখকদের সাথে পরিচয় হওয়ায় আমার একাকীত্ব দূর হয়েছে। “আমি একা নই, আরও অনেকে একই লক্ষ্যে কাজ করছে” এই অনুভূতি আমাকে প্রচণ্ডভাবে উৎসাহিত করেছে। আমি এই কোর্স থেকে বিভিন্ন আঙ্গিকে (যেমন: কবিতা, প্রবন্ধ, ছোটগল্প বা ব্লগ) চিন্তা করতে শিখেছি।
তিনি আরও বলেন, “নতুন টেকনিক এবং সৃজনশীল আইডিয়াগুলো আমার সামনে লেখালেখির এক বিশাল জগত উন্মোচন করে দিয়েছে।”
ময়মনসিংহ ধর্মপ্রদেশ থেকে আগত শ্রেয়া মানিখিন তার অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, “প্রশিক্ষণ শেষে আমার মধ্যে একটি ইতিবাচক চাপ বা দায়িত্ববোধ কাজ করছে। আমি বুঝতে পারছি যে, একজন খ্রিস্টান লেখক হিসেবে সত্য প্রকাশ করা এবং নৈতিক মূল্যবোধ বজায় রাখা আমার বড় দায়িত্ব।”
তিনি আরও বলেন, “সমাজ ও মণ্ডলীর প্রতি আমারও যে দায়বদ্ধতা আছে, তা আমি গভীরভাবে অনুভব করছি। সবচেয়ে বড় কথা হলো পবিত্র আত্মার সহায়তায় আমার সাধারণ শব্দগুলোও যে অন্যের জীবনে আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে তা আমার জন্য বিশেষ অনুপ্রেরণা।”
পরিশেষে ফাদার বিকাশ রিবেরু সবার উদ্দেশ্যে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বলেন, “আমার বিশ্বাস, কোর্সের মাধ্যমে তোমরা একজন সৎ ও নিবেদিত লেখক হয়ে সত্যের অনুসন্ধানে নতুন দর্শনের আলোকবর্তিকা জ্বালাতে লেখনীর হাতকে আরো শাণিত ও সবল করে তুলতে পারবে ।” - জাতীয় যুব কমিশন