জলবায়ু অভিবাসীদের জন্য সঠিক নীতিমালা এগিয়ে নিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা বিষয়ে সাংবাদিকদের সাথে পরামর্শ সভা

জলবায়ু অভিবাসীদের জন্য সঠিক নীতিমালা এগিয়ে নিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা বিষয়ে সাংবাদিকদের সাথে পরামর্শ সভা

গত ১৮ জুন ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, কারিতাস বাংলাদেশের উদ্যোগে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) অডিটোরিয়ামে সাংবাদিকদের সাথে জাতীয় পর্যায়ের একটি পরামর্শমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এই সভায় জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাস্তুচ্যুত জনগণের সুরক্ষা করণীয় বিষয়ক নীতিমালা এগিয়ে নিতে মিডিয়া তথা সাংবাদিকদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন দেশের জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রিন্ট ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকগণ।

এতে অতিথি আলোচক হিসেবে মতামত তুলে ধরেন বিশিষ্ট সাংবাদিক   চর্চা ডটকম-এর  সম্পাদক- সোহরাব হাসান, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির প্রাক্তন সভাপতি রফিকুল ইসলাম আজাদ বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের নির্বাহী সদস্য শাহীন হাসনাত। 

সভার শুরুতে কারিতাস বাংলাদেশের পরিচালক (সিডিআই) থিউফিল নকরেক উপস্থিত সাংবাদিকদের স্বাগত জানিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীসহ দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত, বিপদাপন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ঝুঁকি নিরসন, অভিযোজন জীবনমান উন্নয়নমূলক সংক্রান্ত কারিতাস বাংলাদেশ কর্তৃক গৃহীত বিভিন্ন কার্যক্রমের সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরেন।

. জামিল আহমেদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সমাপনী বক্তব্য রাখেন কারিতাস বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান আলেকজান্ডার ত্রিপুরা।

বিশিষ্ট সাংবাদিক সোহরাব হাসান বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাস্তুচ্যুতদের নিয়ে সংকট দিন দিন আরো বাড়ছে। সংকটটি এখন বহুমুখী এবং অনেক সময় চোখে পড়ে না। ফলে এর সমাধানে পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন করা যেতে পারে। পাশাপাশি তিনি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সরকারি প্রকল্পগুলোর অপচয় কমানোর উপরও মনযোগ দেবার জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি অডিটোরিয়ামে সাংবাদিকদের সাথে জাতীয় পর্যায়ের একটি পরামর্শমূলক সভায় অংশগ্রহণকারীগণ

তিনি আরো বলেন, “ইচ্ছে করে কেউ ভিটে-মাটি ছেড়ে শহরে আসে না। জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী ঠিকানা গ্রামে হওয়ায় শহরে তারা সামাজিক সুরক্ষার কোন সুবিধা পায় না। এর ফলে তাদের বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রভৃতি মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

যথাযথ নীতিমালা প্রণয়ন প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয় প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন,” সাংবাদিক হাসান।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির প্রাক্তন সভাপতি সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম আজাদ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাস্তুচ্যুতদেরক্লাইমেট যোদ্ধাহিসেবে অভিহিত করেন। তিনি উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষদের অবর্ণনীয় দুর্দশা টিকে থাকার চেষ্টার লড়াইয়ের বিষয়টি তুলে ধরেন।

পাশাপাশি তিনি মিডিয়ায় বিষয়টি নিয়মিত গুরুত্বের সাথে তুলে ধরার ক্ষেত্র তৈরির জন্য সাংবাদিকদের নিয়ে পৃথক একটি নেটওয়ার্ক বা ফোরাম তৈরি করার প্রস্তাব দেন। বাছাইকৃত আগ্রহী সাংবাদিকদের ফেলোশিপ প্রদান করা হলে গণমাধ্যমে বিষয়টি আরো গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরার পরিবেশ তৈরি হবে বলে তিনি মত দেন।

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের নির্বাহী সদস্য শাহীন হাসনাত ঢাকাকে প্রাচ্যের রহস্যময় শহর হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “ঢাকায় মানুষের ঢোকার সুযোগ রয়েছে কিন্তু বের হবার সুযোগ নাই। ওই মানুষদের গ্রামে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান না থাকার ফলে ফিরে যাবার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশকে তথাকথিত মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে গণ্য করার ফলে বৈদেশিক সহায়তা কমেছে। কিন্তু, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দুর্যোগের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে,” বলেন সাংবাদিক হাসনাত।

তিনি আরো বলেন, “ঠিক এইখানে একটি শূণ্যতা তৈরি হয়েছে যার সমাধান দ্রুত করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। এর দায়িত্ব সরকার, বেসরকারি সংস্থার পাশাপাশি সাংবাদিকদেরও নেয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।

কারিতাস বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান আলেকজান্ডার ত্রিপুরা সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ কার্বন নিঃসরণ করে খুবই কম কিন্তু ক্ষতির শিকার অনেক বেশি। উন্নত অনেক দেশ অধিক পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ করছে এবং ক্ষতিপূরণ হিসেবে তারা সরকারকে পর্যাপ্ত না হলেও অনুদান সহযোগিতা করছে।

তিনি ওই অনুদানের ব্যবহার যথাযথভাবে হবার উপর জোর দেন। অবকাঠামো উন্নত করার পাশাপাশি তিনি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংকট সমাধানের মত একটি জটিল বিষয়কে অগ্রাধিকার দেবার বিষয়ে তিনি মতামত ব্যক্ত করেন।

জলবায়ু অভিবাসীদের জন্য সঠিক নীতিমালা এগিয়ে নিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা বিষয়ে সাংবাদিকদের সাথে পরামর্শ

সাংবাদিক . দীপু সিদ্দিকী বলেন, “গণমাধ্যমে ক্রীড়া, বিনোদন প্রভৃতি বিষয়ে অনেক সংবাদ ফিচার প্রকাশিত হয়। জলবায়ু অভিবাসীদের সংকট নিয়ে সরকারি নীতিমালার ঘাটতি পরিকল্পনা বিষয়ে সঠিক তথ্যের অভাব রয়েছে। এসব বিষয়ে সাংবাদিকদের কাছে সঠিক তথ্য নেই। ফলে মিডিয়ায় এই সংকটটি তেমনভাবে প্রকাশের উদ্যোগ নিতে সাংবাদিকদের তথ্য ঘাটতিতে পড়তে হয় বলে তিনি মনে করেন।

পরামর্শমূলক সভায় উপস্থিত সাংবাদিকদের মধ্যে মতামত তুলে ধরেন জাহিদা পারভিন ছন্দা, আল আমীন তৌহিদ, জাহিদ আল আমীন, লতিফ রানা, লোকমান কবীর, কে এম আশরাফ উদ্দিনসহ আরো অনেকে।

সভায় আলোচকগণ তুলে ধরেন জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে শহরে নানামুখী সংকটের চিত্র। সংকট সমাধানের জন্য সরকারি নীতিমালা আরো সমন্বিত যুগপযোগী করার উপর জোর দেয়া হয় সভায়।

এছাড়া, বাস্তুচ্যুত মানুষদের সেবা পাবার ক্ষেত্রে সরকারি বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে আরো সমন্বয় বৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে মনে করেন আলোচকগণ। বিষয়টি গুরুত্বের সাথে মিডিয়ায় প্রতিফলিত করার উপর জোর দেয়া হয়। সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়নে সংবাদ মাধ্যমগুলো আরো পর্যালোচনা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করতে পারে বলে সভায় মতামত প্রদান করা হয়।

সভায় জানানো হয়, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়, অস্বাভাবিক জোয়ারের প্লাবন, লবণাক্ততা নদীভাঙনের ফলে জলবায়ু পরিবর্তন জনিত অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের হার ক্রমবর্ধমান।

এসব পরিবার রাজধানী ঢাকা ছাড়াও খুলনা চট্টগ্রামের মতো শহরে আশ্রয় নিচ্ছে। কিন্তু এসব শহরে এসেও তারা  নতুন ধরনের সংকটের মুখোমুখি হয় যেমন: অনিরাপদ আবাসন, পানি-স্বাস্থ্য-শিক্ষা সেবার অভাব এবং সামাজিক বঞ্চনা।

সভা সূত্র জানায়, কারিতাস বাংলাদেশ দুর্যোগ সাড়াদান, প্রশমণ জলবায়ু পরিবর্তন জনিত ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে পর্যন্ত দশ লক্ষের বেশি গৃহ নির্মাণ, পয়নিঃষ্কাশ ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং কমিউনিটি অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে কোটি ৭০ লাখের বেশি মানুষের কাছে ভালবাসাপূর্ণ সেবা পৌঁছে দিয়েছে।

এছাড়াও  কারতিাস ,০০০ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি এবং ১৪,০০০ কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবককে প্রশিক্ষণ প্রয়োজনীয় উপকরণ দিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে।

তবে শুধুমাত্র উপকূলীয় এবং বন্যাপ্রবণ এলাকার দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ঝুঁকি প্রশমনে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় ৩২৯টি ঘূর্ণিঝড় বন্যা আশ্রয় কেন্দ্র তৈরি করেছে।

সভা সূত্র থেকে আরো জানা যায়, শহরাঞ্চলের জলবায়ু পরিবর্তন জনিত অভিবাসীদের মর্যাদাপূর্ণ অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে বর্তমানে বাংলাদেশের খুলনা সাতক্ষীরা জেলায় জার্মান সরকারের বিএমজেড (BMZ) এবং কারিতাস জার্মানীর যৌথ অর্থায়নে পরিচালিত DRR & CCA  প্রকল্পের মাধ্যমে কাজ করছে কারিতাস।

সূত্র আরো জানায়, গবেষণা সংস্থা রামরু (RMMRU) এসসিএমআরের (SCMR) মতে, ২০১১ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে . থেকে .  কোটি মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হতে পারে।

জিআইজেড-এর ২০২৩ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, শহরে আশ্রয় নেয়া জলবায়ু পরিবর্তন জনিত অভিবাসীদের মধ্যে ৫৭ শতাংশই উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার। - প্রেস বিজ্ঞপ্তি